কে দোষী? (Who’s Guilty?)


আসুন আজ আপনাদের একটা গল্প বলি। সত্যি না মিথ্যে সে নয় আপনারাই ঠিক করে নেবেন। আসলে সত্যি মিথ্যের বিভাজন এতটাই অস্পষ্ট, যে অনেক সময়ই আমাদের আর খেয়াল থাকে না জগতে আছি না কল্পজগতে। থাক আর অহেতুক বকব না, গল্পেতেই যাওয়া যাক।

*****
আমাদের গল্পের মূল চরিত্র একটি ছেলে আর একটি মেয়ে। আবার একটা প্রেমের গল্প ভাবছেন নিশ্চয়ই? নাঃ, এ এক মা আর ছেলের গল্প। ধরা যাক দুজনের নাম X আর Y। অস্বস্তি হচ্ছে? স্বাভাবিক, আমাদের সকলেরই একটা নিজস্ব স্বত্বা চাই, সে আমরা যতই equality-র পূজারী হই না কেন। ইংরাজিতে লিখলাম কারণ শোনা যায় ওটি বাংলাদেশের ধারণা নয়, বাইরের আমদানি। এই গরিব দেশের লোকগুলি নাকি পেট ভরাতেই এত ব্যস্ত ছিল যে ওসব গুরুগম্ভীর তত্ত্ব নিয়ে ভাববার সময় পায়নি। যাইহোক আমাদের সকলের মানসিক শান্তির জন্য একটা নাম দেওয়া যাক, ধরুন সুমন আর মৃণালিণী।

মৃণালিণীর ২০ বছর বয়সে সুমনের জন্ম। না, তখনো ওর বিয়ে হয়নি, তারপরেও কোনোদিন নয়। এখানে যদি আপনি মৃণালের চরিত্র সম্বন্ধে উৎসুক হয়ে ওঠেন, তবে আপনাকে হতাশ হতে হবে। এ গল্প মৃণালের ২০ বছর পরের ঘটনা নিয়ে, যে সময় সে পৃথিবীর সবকিছু ভুলে গিয়ে মন লাগিয়েছিল সুমনকে বড় করতে। সুমনকে রোজ সন্ধ্যায় সে পড়াতে বসত, জ্বরের সময় মাথার কাছে বসে থাকত, মাঠে খেলতে নিয়ে যেত। এভাবে কবে যেন নিজের অজান্তেই সে সুমনকেই নিজের জগত করে নিল, এর বাইরে কিছু সে ভাবতেই পারত না। সুমন ও মাকে ছাড়া কিছু করার কথা ভাবতে পারে না, তার জীবনের সব সিদ্ধান্তেই মা বিদ্যমান। এক আদর্শ মা-ছেলের সম্পর্ক, তাই না?

এভাবেই সুমন বড় হয়ে ওঠে। পড়াশোনায় ভাল সে, একদিন ভাল কলেজেও ভর্তি হয়। তারপরেই তার সামনে খুলে যায় অন্য জগৎ। আসে পড়াশোনার জন্য বাইরে যাওয়ার সুযোগ, যা ছিল ওর, বা বলা ভাল ওদের দুজনর, স্বপ্ন। কিন্তু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সব আশা ম্লান হয়ে যায় ওর। যে মা সারাজীবন পাশে থেকেছে, তাকে একা ফেলে রেখে যাবে, ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যায় সুমনের। ধীরে ধীরে বিষণ্ণতায় ডুবে যেতে থাকে সুমন, যার ছাপ পড়ে ওর পড়াশোনায়। ছেলের হঠাৎ পরিবর্তন মেনে নিতে পারে না মৃণাল; রোজ বাক্যবাণে বিদ্ধ করতে শুরু করে সুমনকে। যে সম্পর্ক একদিন ছিল হিমালয়ের মত অটুট, ভাঙন ধরে আজ তাতে। সুমন আজ তার অবস্থার জন্য দোষারোপ করতে শুরু করে তার মাকেই, যাকে সে একদিন দেবতার মত পূজা করত।

আচ্ছা আপনারাই বলুন তো, দোষটা কার ছিলো? মৃণালের, যে কিনা সুমনকে নিজের সম্পত্তি ভেবে নিয়েছিল? নাকি, সুমনের, যে এক কল্পজগতের মধ্যে সারা জীবন কাটিয়ে, জগতটাকে চিনতে পারেনি? নাকি ওদের দুজনেরই, একে অপরকে এতটা ভালবেসে ফেলেছিল?

আপনারা ভাবছেন, গল্পটা তো শেষ হল না। এ গল্প শেষ হয় না বাবুসাহেব, শুধু নামগুলো পাল্টায়, চরিত্র গুলো পাল্টায়, X আর Y ঘরে ঘরে, কালে কালে গল্পের জাল বুনতে থাকে, সেখানে কখনো মৃণাল একা পড়ে থাকে, কখনো বা সুমন পড়ে থাকে কোনো রেললাইনের ধারে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *