পরিবর্তন (Change)


দোতলার বারান্দায় বসে মুড়ি চানাচুর খাচ্ছিল দশ বছরের একটা ছেলে। একটু আগে পাকিস্তান হারিয়েছে ইন্ডিয়াকে, মন খারাপের একটা দমকা বাতাস তাই যেন আটকে রয়েছে চারপাশে। ভোম্বলদের বাড়ি প্রচুর বাজি আনা হয়েছিল প্রতিবারের মত এবারও, এখন যেগুলো ছাদের কোণায় বৃষ্টির জলে ভিজছে. পাড়ার কুকুরগুলোর চিৎকারেও আজ যেন একটু ঝিমিয়ে পড়া ভাব। মধ্যবিত্ত জীবনের ক্ষণিকের দখিন হাওয়ার আশা বিলীনের হতাশা যেন ঘিরে ধরেছে দশ বছরের ছেলেটাকেও। হারটা খেলার অঙ্গ সে জানে, কিন্তু তবুও মন মানতে চায় না তার। দুঃখটা আরও বেশী করে বাজে হারটা পাকিস্তানের কাছে বলে, যদিও মনের গভীরে হাতরেও কারণ খুঁজে পায় না তার। ছোটোবেলা থেকে ও জেনে এসেছে আর কোনো দেশের সঙ্গে যাই হোক না কেন, পাকিস্তানের কাছে হারা সবচেয়ে বেশী লজ্জার।

ভারাক্রান্ত মনে সে তাকিয়ে ছিল বাইরের দিকে, হঠাৎ একটা শোরগোলে তার ধ্যানভঙ্গ হল।

**********

নীচে ফিয়াট গাড়ির হর্ণটা এক লহমায় অতীত থেকে বাস্তবে নিয়ে এল ২৬ বছরের মুস্তাক আলিকে। সেদিনের সেই শোরগোলের কথা মনে পড়লে আজও আতঙ্কের শিহরণ খেলে যায় ওর মনে।

মামা যখন জলে ভেজা চোখে ওকে জানিয়েছিল ওর বাবা বাড়ির সামনেই পথ-দুর্ঘটনায় চলে গেছে ওদের ছেড়ে, নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারেনি ও। সেই ধাক্কা মা কোনোদিন সামলে উঠতে পারেনি; দু-তিন মাসের মধ্যেই ইহলোকের পালা সাঙ্গ করে পাড়ি দিয়েছিল অজানার উদ্দেশ্যে। তারপর মামার বাড়িতে বছর দু-এক কেটেছিল ওর। কিন্তু পরের বাড়িতে বোঝা হয়ে থাকতে না পেরে একদিন বেড়িয়ে পড়ে বাড়ি ছেড়ে। আব্দুল চাচার সঙ্গে ওর দেখা হয় তারও বছরখানেক পর; রাস্তায় মজুর খেটে আর কলের জল খেয়ে ও বেঁচে তখন। তবুও এত দারিদ্রের মধ্যেও যখন ২০ হাজার টাকা কুড়িয়ে পেয়ে ফেরত দিতে গেছিল চাচাকে, চাচা খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়নি ওকে।

তারপর ধর্মবদল, পাকিস্তানে পাড়ি দেওয়া, ছোটোবেলার স্বপ্ন ক্রিকেট নিয়ে আবার মেতে ওঠা, এর মধ্যে ও একবারও ভোলেনি সেদিনের সেই দুপুরটা। তাই আজ পাকিস্তান ক্রিকেট টীমের সঙ্গে খেলতে এসে একছুটে চলে এসেছিল সেই বাড়িটায়, যেখানে সব স্বপ্ন একদিন ভেসে যেতে দেখেছিল মুস্তাক আলি, সেদিনের দশ বছরের বিশ্বম্ভর পাল।  আজও সে তার জন্মভূমি ভারতকে ভালবাসে, কিন্তু তার সাথে সে আরেকটা দেশকেও ভালবেসে ফেলেছে, পাকিস্তানকে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *